পবিত্র কোরবানি,
ইব্রাহিম (সাঃ) এর স্মৃতি রক্ষার্থে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানী
মোঃ শাফিউর রহমান কাজী :
ঈদুল আযহা আমাদের মাঝে আগমন। মুসলিম জাতির আনন্দ উৎসবের প্রধান দু’টির মধ্যে কুরবানির. ঈদ বা ঈদ-উল-আযহা অন্যতম। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি, কুরবানি মানে ত্যাগ-তিতীক্ষা। আর এই ত্যাগ তীতিক্ষার মধ্যেই আনন্দ নিহিত। আর এই কুরবানির ইতিহাসটা মুসলিম মিল্লাতের প্রতিষ্ঠাতা, হযরত ইব্রাহিমের (আ.) সাথে জড়িত। হযরত ইব্রাহিমকে (আ.) বিভিন্ন ত্যাগ, কুরবানি ও পরীক্ষার কন্টকাকীর্ণ রাস্তা অতিক্রম করতে হয়েছে। তার কুরবানির আদর্শ শাশ্বত।
জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোন হালাল পশু যবেহ করার নাম কুরবানি। কোন কারণ বশত ১০ তারিখে কুরবানি করতে না পারলে ১১ বা ১২ তারিখেও কুরবানি করা যায়।
প্রতিটি কালের স্তরে কালের চাহিদা অনুযায়ী মুসলিম জাতি তার আদর্শ সামনে রেখে জাতির অস্তিত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষার প্রয়োজনে কুরবানি দেয়। তবে আল্লাহপাক বলেন, এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তার কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া (সূরা হজ্ব-৩৭)। কুরবানির মূল উদ্দেশ্য কী? আর ঐ উদ্দেশ্যকে জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ইব্রাহিম (আ.)-এর ঘটনায়। হযরত ইব্রাহিম (আ.) ভীষণ কঠিন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তিনি সে সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এবং আল্লাহর প্রতি গভীর মহব্বত ও পূর্ণ আনুগত্যের পরিচয়দানে তিনি সাফল্য অর্জন করেছিলেন। তার উদাহরণ পবিত্র কুরআনে এভাবে উল্লেখ রয়েছে। “যখন ইব্রাহিমের পরোওয়ারদেগার তাহাকে পরীক্ষা করিলেন কতিপয় বিষয়ের দ্বারা এবং তিনি সব বিষয়ে পূর্ণ সাফল্য অর্জন করিলেন, তখন আল্লাহতায়ালা বলিলেন, আমি আপনাকে লোকদের ইমাম প্রধান বানাইব এবং আদর্শ হওয়ার মর্যাদা দান করিব” (১ পারা ১৫ রুকু)। অতি আদরের দুধ খাওয়া শিশু ইসমাইলকে তার মাসহ মক্কার জনশূন্য বিরল এলাকায় আল্লাহর হুকুমে ছেড়ে যাওয়া। এছাড়া আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া এবং পুত্রকে আল্লাহর নামে কুরবানি করার ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যার বর্ণনা কুরআনপাকে আল্লাহপাক এভাবে দিয়েছেন-”সেই পুত্রটি পিতা ইব্রাহিমের সঙ্গে চলাফেরা করিতে পারে, তখন পিতা বলিলেন, হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখিয়াছি, তোমাকে জবাই করিতেছি। তুমি ভাবিয়া দেখু, তোমার মতামত কি? পুত্র উত্তর করিল: হে পিতা, আপনি যে বিষয়ে আদিষ্ট হইয়াছেন তাহা সম্পর্ণ করুন। ইন্শা-আল্লাহ আমাকে ধৈর্যশীল পাইবেন”। অতঃপর যখন পিতা-পুত্র উভয়ে আল্লাহর হুকুম পালনে পূর্ণ অনুগত হইলেন এবং পিতা পুত্রকে অধঃমুখী শায়িত করিলেন এবং আমি পিতাকে এই বলিয়া ডাকিলাম- “হে ইব্রাহিম নিশ্চয়ই তুমি স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করিয়াছ। এইরূপ (সৎ সাহসের) প্রতিদান আমি নিষ্ঠাবান সৎ কর্মশীল সমস্ত ব্যক্তিকেই দান করিয়া থাকি। নিশ্চয়ই উহা একটি বড় পরীক্ষা ছিল এবং কুরবানির জন্য একটি পশু পুত্রের বদলে দান করিলাম। আর পরবর্তী লোকদের মধ্যে তাহার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করিলাম যে, সকলেই বলিবে ইব্রাহিমের প্রতি সালাম” (সূরা সাফফাত-২৩ পারা ৭ রুকু)। কুরবানির সে দৃশ্য ছিল বড়ই আশ্চর্যজনক। আর এই স্মৃতি রক্ষার্থে ও আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য প্রতিবছর কুরবানী দিয়ে থাকি।
ইব্রাহিম (আঃ) এই আদর্শকে জীবিত রাখার জন্যেই বছরে বছরে নিজের জানের চেয়ে প্রিয় পুত্রের পরিবর্তে একটা গরু, ছাগল বা উট কুরবানি করে নিজের নফসকে আল্লাহর সামনে কুরবানি করতে হয়।
যেই সকল লোকের প্রতি রমজানের রোযার ফিতরা দান করা ওয়াজিব, তাদের প্রতিই কুরবানি করা ওয়াজিব। দরিদ্র লোক ও মুসাফিরের প্রতি-কুরবানি করা ওয়াজিব নয়। অবশ্য কোন দরিদ্র লোক যদি কুরবানি করে, তবে তা জায়েয হবে এবং সে ইহার ছোয়াব পাবে।
কোন দরিদ্র লোক যদি কুরবানি করার জন্য কোন পশু খরিদ করে অথবা কুরবানি করার মানত করে, তবে তখন তার প্রতি কুরবানি করা ওয়াজিব। কোন মৃত ব্যক্তির পক্ষ হতে কুরবানি করা ওয়াজিব নয়। তবে কোন মৃত ব্যক্তির পক্ষ হতে কুরবানি করলে তা জায়েয হবে।
কোন মৃত ব্যক্তি যদি মৃত্যুর পূর্বে কুরবানী করার জন্য ওছিয়ত করে থাকে, তবে ইহা আদায় করা ওয়ারিসদের প্রতি ওয়াজিব। আর সেই কুরবানীর গোশত কুরবানিদাতাগণ খেতে পারবে না-সম্পূর্ণই বিলিয়ে দিতে হবে।
কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রয় করে সম্পূর্ণ মূল্যই দরিদ্রদেরকে দান করতে হবে। কুরবানির পশুর বয়স নিম্নলিখিত হতে হবে; যথা- গরু ও মহিষ কমপক্ষে দুই বৎসর বয়সের, ছাগল ও ভেড়া কমপক্ষে এক বৎসর, উট কমপক্ষে পাঁচ বৎসব, দুম্বা কমপক্ষে ছয় মাস বয়সের হতে হবে। এর বেশি হলে কোন ক্ষতি নেই। কুরবানির পশু সম্পূর্ণ নিরোগ ও নিখুঁত হতে হবে। পা ল্যাংড়া, কান কাটা, শিং ভাঙ্গা, চক্ষু কানা প্রভৃতি কুরবানির পশুর কুরবানি করা জায়েজ হবে না।
গরু, মহিষ, উট একটি পশু সাত জন পর্যন্ত ভাগী হয়ে কুরবানি করা যায়; কিন্তু ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা একজনের পক্ষ হতে একটিই দিতে হবে। এতে একাধিক ব্যক্তি অংশীদার হওয়া জায়েষ নেই। একাধিক ব্যক্তি অংশীদার হয়ে একটি পশু কুরবানি করলে প্রত্যেককেই তুল্য অংশে এর মূল্য দিতে হবে এবং তুল্য অংশে গোশত বণ্টন করে নিতে হবে। এতে কম-বেশি করলে কারও কুরবানি জায়েয হবে না। আর পশুর চামড়া সাভধানতা অবলম্বন করে বা সঠিক নিয়মে ছাড়াতে হবে, সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে। পশুর চামড়া বিক্রয় করা অর্থও প্রত্যেকে সমানভাগে ভাগ করতে হবে যেন, নিজ হাতে নিজের ইচ্ছামত দান করবে। এই এক কুরবানির মধ্যেই লুক্কায়িত আছে মুসলমানের সারা বছরের হাজারো কাজের কুরবানি।
পশুর বর্জ নির্ধারিত জায়গায় বা ডাসবিনে ফেলা অতিজরুরি। চারপাশের পরিবেশকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখাও প্রয়োজন, যেন দুর্গন্ধ না ছড়ায় সেদিকে সবার খেয়াল রাখা উচিত।