নিজস্ব প্রতিবেদক |
একজন শিক্ষার্থীর হারিয়ে যাওয়া পরীক্ষা, অপমানের ক্ষত আর দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ—সবকিছু যেন একসাথে বিস্ফোরিত হলো আজ। ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদে থমকে যায় একাধিক গণপরিবহন, আর সামনে আসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা দুর্ব্যবহারের অভিযোগ।
আজ ছিল পাইথন প্রোগ্রামিং বিষয়ের পরীক্ষা। সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে রায়েরবাগ থেকে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে রওনা হন ঢাকা পলিটেকনিকের এক শিক্ষার্থী। কিন্তু গুলিস্তানে পৌঁছানোর পর শুরু হয় তার দুর্ভোগের অধ্যায়।
শিক্ষার্থীর অভিযোগ, একের পর এক বাস এলেও তাকে উঠতে দেওয়া হয়নি। স্টুডেন্ট পরিচয় দেওয়ার পরও কিছু বাসের কর্মীরা তাকে নিতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি বাসের গেটে ঝুলে অনুরোধ করার পরও তাকে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এতে তিনি শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন বলেও দাবি করেন।
শিক্ষার্থীর ভাষায়,
“আমি বারবার বলেছি, আমার পরীক্ষা আছে। আমি একজন স্টুডেন্ট। কিন্তু কেউ শুনলো না। একের পর এক বাস চলে গেল। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ২০০ টাকা ভাড়া দিয়ে বাইকে করে ক্যাম্পাসে রওনা দেই।”
সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে সকাল ৯টা ২৬ মিনিটে ক্যাম্পাসে পৌঁছান তিনি। কিন্তু ততক্ষণে মূল্যবান পরীক্ষার সময় প্রায় শেষ। একজন শিক্ষার্থীর কাছে একটি পরীক্ষা শুধু একটি বিষয় নয়; এটি তার পরিশ্রম, সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রতিবাদস্বরূপ শিক্ষার্থীরা বেশ কয়েকটি বাস আটকে রেখে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাদের অভিযোগ, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার্থীরা গণপরিবহনে হয়রানি, অপমান এবং বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন।
শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন,
“একজন শিক্ষার্থী যদি পরিবহন সংকট ও অসদাচরণের কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারে, তবে সেই ক্ষতির দায় কে নেবে?”
শিক্ষার্থীরা আরও অভিযোগ করেন, শুধু ছেলেরা নয়, ঢাকা পলিটেকনিকের ছাত্রীদের সঙ্গেও বিভিন্ন সময়ে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। তাদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে ছাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিযোগও শোনা গেছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীরা বলেন,
“আমরা ভিক্ষা চাই না, দয়া চাই না। আমরা শুধু একজন শিক্ষার্থী হিসেবে সম্মান চাই। দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাতাদের যদি প্রতিদিন রাস্তায় অপমানিত হতে হয়, তাহলে এটি শুধু একজন শিক্ষার্থীর অপমান নয়, পুরো জাতির অপমান।”
তারা আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে কোনো বাস কোম্পানি বা পরিবহনের কর্মীরা যদি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও সংগঠিত প্রতিবাদ গড়ে তোলা হবে। শিক্ষার্থীদের দাবি, গণপরিবহনে নিরাপদ ও সম্মানজনক যাতায়াত নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
একজন শিক্ষার্থীর কণ্ঠে আজ যেন হাজারো শিক্ষার্থীর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রতিধ্বনিত হয়েছে—
“যে দেশে গুণের কদর নেই, সে দেশে গুণী জন্মায় না। শিক্ষার্থীদের সম্মান দিতে শিখতে হবে। স্নেহের ডোরে তাদের চলাচলে সহযোগিতা করতে হবে, কারণ তারাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে।”
আজকের এই ঘটনা শুধু একটি মিস হওয়া পরীক্ষার গল্প নয়। এটি শিক্ষার্থীদের মর্যাদা, নিরাপত্তা, অধিকার এবং সমাজের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও পরিবহন মালিকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের আহ্বান—আর নয় অবহেলা, আর নয় অপমান; শিক্ষার্থীদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিন।
নইলে আজকের ক্ষোভ আগামী দিনের বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা